মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা
বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক একটি পৃথক মন্ত্রণালয় আছে, যেমনটা পৃথিবীর অনেক দেশেই নেই। আরও সুখের বিষয় হলো, এই মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটটি বাংলা ভাষায়, যেমনটা দেশের বেশির ভাগ মন্ত্রণালয়ের নেই।
মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটের ঠিকানা: www.molwa.gov.bd। ওয়েবসাইটটি কেমন তা দুইভাবে বলা যায়। ভালো এবং খারাপ। দুর্বলতা খুঁজতে গেলে ওয়েবসাইটি নিয়ে অনেক কিছুই বলা যায়, সেদিকে না গিয়ে বরং মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইট নির্মাণের সঙ্গে যুক্ত সবাইকে ধন্যবাদ দিতে হয় এ জন্য যে তাঁরা মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কিত সাধারণের জানার আগ্রহ রয়েছে এমন দরকারি বিষয়গুলোর জন্য ওয়েবসাইটের প্রথম পাতায় অনেকগুলো পৃথক বোতাম রেখেছে। যেমন: আমাদের গর্ব বীর শ্রেষ্ঠ, বীর উত্তম, বীর বিক্রম ও বীর প্রতীকদের জন্য পৃথক বোতাম রাখা হয়েছে ‘খেতাবপ্রাপ্তরা’ শিরোনামের অধীনে; ‘মুক্তিযুদ্ধের আর্কাইভ’ শিরোনামের অধীনে আছে স্বাধীনতার ঘোষণা, মুজিবনগর সরকারের স্বাধীনতার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা, দলিলপত্র, স্থির চিত্র, চলচ্চিত্র এবং বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণবিষয়ক পৃথক বোতাম। এ ছাড়া প্রথম পাতায় আরও রয়েছে মন্ত্রণালয়সংক্রান্ত তথ্য জানার জন্য আলাদা বোতাম, মন্ত্রণালয়ের প্রকল্পসমূহ, দরপত্র এবং প্রজ্ঞাপনসমূহসংক্রান্ত পৃথক বোতাম। অবাক করা ব্যাপার হলো, বেশির ভাগ বোতামের অধীনেই এখন পর্যন্ত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। এমনকি পাতাগুলো যে নির্মাণাধীন সে কথাও উল্লেখ নেই। জাতিসংঘউন্নয়ন তহবিল—ইউএনডিপির সহযোগিতায় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অ্যাকসেস টু ইনফরমেশন কর্মসূচির তৈরি করা এই ওয়েবসাইটের সবচেয়ে সমৃদ্ধ অংশটি হলো ‘মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা’। সরকারের গেজেটে প্রকাশিত মুক্তিযোদ্ধাদের পূর্ণ তালিকা এখানে পাবেন। আশা করা যায়, ওয়েবসাইটের শূন্য পাতাগুলোয় শিগগিরই তথ্য যোগ হবে।আর অতি দুর্বল স্থির চিত্রের পাতাটি সবল করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর
ইন্টারনেটে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক সমৃদ্ধ এক ওয়েবসাইট তৈরি করেছে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর। এর সীমাবদ্ধতা হলো এই ওয়েবসাইটটির একটি পূর্ণাঙ্গ বাংলা সংস্করণ নেই। সাইটটিতে মুক্তিযুদ্ধসংক্রান্ত অনেক মূল্যবান তথ্য রয়েছে। দেশের প্রথম ‘সংবিধানের প্রস্তাবনা’ যাঁরা প্রস্তাব করেছেন তাঁদের সইসহ স্ক্যান করে ‘বাংলাদেশ’ শিরোনামের বোতামে দেওয়া আছে। স্বাক্ষরকারীরা সেখানে পুরো নাম লেখায় এই নামগুলোর সূত্র ধরে স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাস সম্পর্কে সম্যক ধারণা লাভ করা সম্ভব হবে। ‘দিজ মান্থ ইন ১৯৭১’ শিরোনামের বোতামের অধীনে মার্চ মাসের ১ তারিখ থেকে ৩১ পর্যন্ত ১৯৭১ সালে কী হয়েছিল সে কথা চমত্কারভাবে বাংলা ভাষায় লেখা আছে। ‘লিবারেশন ওয়ার’ বোতামের অধীনে ১১টি বিষয়ভিত্তিক প্রবন্ধ আছে। তবে ইংরেজিতে লেখা এই প্রবন্ধগুলো ক্ষেত্রবিশেষে অসম্পূর্ণ মনে হতে পারে। যেমন বাংলাদেশ লিবারেশন আর্মড ফোর্সেস প্রবন্ধে ১১টি সেক্টরের কমান্ডারদের নাম দেওয়া হয়েছে। সেখানে তিনটি সেক্টরের সেক্টর কমান্ডার একটি নির্দিষ্ট মেয়াদের পর পরিবর্তন হয়েছেন উল্লেখ করা হলেও এ কথার উল্লেখ নেই যে কেন তাঁরা দায়িত্ব ছেড়ে দিয়েছেন। যাঁরা স্বাধীনতার ইতিহাস জানেন তাঁরা সবাই জানেন যে ওই তিনজন মেজর ওই সময়ে নতুন দায়িত্ব নিয়ে তিনটি পৃথক ফোর্স যথা: জেড ফোর্স, কে ফোর্স এবং এস ফোর্সের নেতৃত্ব দিয়েছেন। এই কথার উল্লেখ থাকলে ভালো হতো।
কিছু কিছু ক্ষেত্রে বিভিন্ন সূত্র থেকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংগ্রহ করে এখানে উল্লেখ করা হয়েছে, যেমন— ভারত সরকারের তথ্য অনুযায়ী, স্বাধীনতা যুদ্ধে ভারতের ১৪২১ জন সেনাসদস্য মারা গিয়েছে।
১৯৯৬ সালের ২২ মার্চ প্রতিষ্ঠিত মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর বাংলাদেশের আগামী প্রজন্মের জন্য তো বটেই, এ দেশের ইতিহাস ও ঐতিহ্য লালনের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। এই উদ্যোগে আপনিও সম্পৃক্ত হতে পারেন। কীভাবে সে কথা জানতে চাপুন ‘ডোনারস’ বোতামটি। এ পর্যন্ত প্রায় সাড়ে চার লাখ দর্শনার্থী জাদুঘরে গিয়েছেন। আপনিও যেতে পারেন। ঠিকানা পাবেন ‘কন্টাক্ট আস’ বোতাম চেপে। এখানে আপনার মতামতও জানাতে পারেন। মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর সম্পর্কে নিয়মিত হালনাগাদ থাকা যাবে তাদের নিউজলেটারের গ্রাহক হয়ে। জয়েন মেলিং লিস্ট বোতাম চেপে আপনি গ্রাহক হতে পারবেন। আরও বিস্তারিত জানতে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ওয়েবসাইটটি দেখতে পারেন। ঠিকানা: www.liberationwarmuseum.org
গণহত্যার আর্কাইভ
ইন্টারনেটে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক আরেকটি ওয়েবসাইট হলো বাংলাদেশ জেনোসাইড আর্কাইভ (www.genocidebangladesh.org)। একসঙ্গে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক এত তথ্য আর ওয়েবলিংক অন্য কোথাও পাওয়া যাবে না। গুগল বা ইয়াহুর মতো বিশ্বসেরা সার্চ ইঞ্জিনগুলোতে খুঁজেও এত তথ্য পাওয়া যায়নি।যা এখানে আছে।ওয়েবসাইটটির বৈশিষ্ট্য হলো পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী দ্বারা ১৯৭১ সালে যে গণহত্যা সংঘটিত হয়েছে সে সংক্রান্ত অডিও, ভিডিও, স্থিরচিত্র, ওয়েবসাইট ইত্যাদির চমত্কার আর্কাইভ যেখানে কোনো মত বা পথের কথা নয়, বরং সব মতাদর্শের সবকিছুই এখানে রাখা হয়েছে। এখানে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে এত কিছু আছে যে একবার দেখা শুরু করলে শেষ করতে কয়েক মাস লেগে যাবে। এই ওয়েব আর্কাইভে ইংরেজি এবং বাংলা উভয় ভাষার প্রচুরসংখ্যক ‘রিডিং মেটেরিয়াল’ রয়েছে। ওয়েবসাইটটি ঘুরে মনে হয়েছে সাইটটি যাঁরা পরিচালনা করছেন তাঁরা অত্যন্ত সততার সঙ্গে ১৯৭১ সংক্রান্ত সব দলিল এখানে জমা করেছেন। কিন্তু তাঁরা পাঠককে কোনো একদিকে পরিচালিত করতে চাননি। বরং পাঠকের ওপর তাঁরা আস্থা রেখেছেন। পাঠক তার মতো করে ডকুমেন্ট পড়ে নিজের মতো সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। এমনকি মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা নিয়ে বিশ্বের যেকোনো প্রান্তের যে কেউ তাঁর করা ওয়েবভিত্তিক কাজগুলোর ওয়েবলিংক এখানে জমা দিতে পারেন। এই ওয়েবসাইটটি ইতিহাসের এক নির্মোহ উপস্থাপনা। এখানে এলে জানা যায়, ১৯৭১ হঠাত্ করে তৈরি হয়নি। এর যে একটি পটভূমি আছে সেসংক্রান্ত ইতিহাসনির্ভর তথ্য-উপাত্ত এই ওয়েবসাইটে দেওয়া হয়েছে। এই ওয়েবসাইটটি ক্রিয়েটিভ কমনসের আওতায় প্রকাশিত হওয়ায় এখান থেকে তথ্য নিতে কোনো বাধা নেই।
শেষ কথা
তথ্যপ্রযুক্তিকে জনগণের কাছে পৌঁছে দিতে বর্তমান সরকার ডিজিটাল বাংলাদেশ শিরোনামে নতুন এক ধারণা দেশব্যাপী ছড়িয়ে দিতে চাইছে। সেই ধারণাকে যাঁরা লালন করেন তাঁদের দায়িত্ব হলো সহজ বাংলায় মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসভিত্তিক ওয়েবসাইট আগামী প্রজন্মের জন্য রেখে যাওয়া এবং এই প্রজন্মকে প্রযুক্তি শিক্ষায় সুশিক্ষিত করে তোলা।
No comments:
Post a Comment